ইলিশ মাছের প্রকারভেদ এবং পুষ্টিগুণ!

ছোটবেলায় আমরা ইলিশ মাছ সম্পর্কে নানান কথা শুনেছি। বইয়ে পড়েছি বিভিন্নরকম তথ্য। তবে খুব কমই মনে রেখেছি আমাদের ছোট্ট মস্তিষ্কে। ইলিশের উৎপাদনের সাথে সাথে লোকেমুখে এর চর্চাও যেন কমে গেছে। 

ইলিশ মাছ

তবে আজ আমরা ইলিশ মাছের কিছু মজাদার বিষয় উপস্থাপন করবো। যা আপনার মস্তিষ্কে থেকে যাবে আপনার নাতি-নাতনীদের গল্প শোনানোর আগ পর্যন্ত। 

নীচে স্ক্রল করে জেনে নিন ইলিশ মাছ সম্পর্কে চমকপ্রদ কিছু তথ্য। 

ইলিশ মাছ ও এর প্রকারভেদ  

বাঙালির হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের সাথে ইলিশ মাছ ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। স্বাদে ও পুষ্টিগুণেও এই মাছের জুড়ি নেই। আর এ জন্যই হয়তো ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ হিসেবে স্বীকৃত। 

আমরা হয়তো অনেকেই জানি না এটি একটি সামুদ্রিক মাছ। বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের পশ্চিম নদীতে সাধারণত এরা ডিম পেড়ে থাকে। ইলিশের শরীর ধাতব রুপালি রঙের আঁশ দ্বারা আবৃত এবং দেহ বেশ চ্যাপ্টা ও মাথার উপরিভাগ পুরু ত্বকে ঢাকা থাকে৷ 

সাধারণত যে তিন প্রজাতির ইলিশ বাংলাদেশে পাওয়া যায় তা হলো: পদ্মা ইলিশ, গুর্তা ইলিশ ও চান্দিনা। এদের মধ্যে শুধুমাত্র পদ্মা ইলিশই পদ্মা, মেঘনা, ও যমুনা নদীতে দেখা যায়। বাকি অন্য দুই প্রজাতির ইলিশ সম্পূর্ণ রুপে সামুদ্রিক। এরা নদীতে আসে না।

ইলিশ মাছের খাবার

ইলিশ সাধারণত প্ল্যান্কটোনভোজী। শৈবাল, ডেসমিড, কোপিপোড, ডায়াটম, রটিফার ইত্যাদি জাতীয় উদ্ভিদ এরা খেয়ে থাকে। তবে একটি অদ্ভূত ব্যাপার হলো এরা বয়স ও মৌসুমের উপর ভিত্তি করে খাবার গ্রহণ করে। 

অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় এরা উদ্ভিদকণা খায় এবং প্রাপ্ত বয়স্ক আবস্থায় প্রাণিকণা খেয়ে থাকে। এছাড়া বয়স্ক মাছেরা বিভিন্ন আবর্জনা খায়। 

আবার, অভিপ্রয়ানের সময় এরা খুব একটা খাবার গ্রহণ করে না। তবে ডিম পাড়ার সময় এরা অধিক পরিমাণ খাদ্য খেয়ে থাকে।

ইলিশ মাছের প্রজনন ও জীবনচক্র

ইলিশ মাছ সাধারণত এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে। বছরে সর্বোচ্চ দুইবার এরা প্রজননে অংশ নেয়। এদের প্রধান প্রজননকাল মৌসুমি বায়ুর শুরু থেকে শীতের আগ অব্দি; অর্থাৎ নভেম্বর মাস পর্যন্ত। আর দ্বিতীয় প্রজননকাল জানুয়ারি থেকে মার্চ। 

ইলিশ মাছ মূলত অগভীর ঘোলা জলে প্রজনন করে। সন্ধ্যা ও ভোরবেলায় এরা সঙ্গিনীর সাথে মিলিত হয়।

এবং আপনি শুনলে অবাক হবেন, একটি মা ইলিশ একাধারে আড়াই থেকে ষোল লক্ষ পর্যন্ত ডিম ছাড়তে পারে। 

ইলিশ মাছের পুষ্টিগুণ

ইলিশ মাছ খেতে যেমন সুস্বাদু ঠিক তেমনি এটি পুষ্টিগুণেও ভরপুর। 

চলুন এক নজর দেখে নেওয়া যাক এই মাছে কোন কোন পুষ্টি গুণাগুণ বিদ্যমান। 

  • ইলিশ মাছে রয়েছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড। যা চোখের জন্য বেশ কার্যকারী।
  • ইলিশ মাছে প্রচুর পরিমাণে তেল পাওয়া যায়। এই তেল ক্ষতিকারক নয়, বরং বেশ উপকারী। ইলিশ মাছের তেল দেহের নার্ভ কে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি দেহের রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে আনে।
  • দেহের ত্বক ও চুলের জন্য ভিটামিন ডি যুক্ত খাবার প্রয়োজন। আর এই ভিটামিন ডি এর অভাব পূরণ করতে ইলিশ মাছ বেশ কার্যকারী।
  • রক্তের কোলেস্টেরল এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন স্থানের ব্যথা সারতেও এর ভূমিকা ব্যাপক।
  • ইলিশ মাছে রয়েছে আয়োডিন যা থাইরয়েড গ্লান্ড সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।
  • ইলিশ মাছে বিদ্যমান ফসফরাস দাঁত শক্ত ও মজবুত করতে বেশ কার্যকর।
  • রক্তনালির স্বাস্থ্য রক্ষায় বেশ উপকারী ইলিশ মাছ। এতে Dha ও Epa নামক ওমেগা- থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। তাই ইলিশ মাছ খেলে দেহের রক্ত সঞ্চালনের হার বৃদ্ধি পায় তার ফলে থ্রম্বসিসে নামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

>> কোন মাছে কত প্রোটিন | জেনে নিন প্রোটিন যুক্ত মাছের তালিকা!

ইলিশ মাছের পাশ্বপ্রতিক্রিয়া 

ইলিশ শুধু মাছই নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য। প্রাচীনকাল থেকেই ইলিশের সাথে আমাদের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মাছে ভাতে বাঙালির অতি প্রিয় একটি খাবার এই ইলিশ মাছ। ইলিশ মাছের পুষ্টিগুণও রয়েছে ব্যাপক। তবে পুষ্টিগুণের পাশাপাশি এ মাছের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। 

এলার্জি

যাদের এলার্জি জনিত সমস্যা রয়েছে তাদের এই মাছ না খাওয়াই ভালো। কারণ অনেক সময় দেখা যায় যে এই এলার্জি থেকে অনেক বড় সমস্যা হয়ে থাকে।

অতিরিক্ত কাঁটা

ইলিশ মাছে প্রচুর পরিমাণে কাঁটা রয়েছে। এ মাছ খাওয়ার সময় গলায় কাঁটা আটকে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। এ কাঁটা গলায় একবার আটকে গেলে ভুক্তভোগী কে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। বিশেষ করে ছোট বাঁচ্চাদের ক্ষেত্রে। তাই এই মাছ খাওয়ার সময় বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করা খাওয়া উচিৎ। 

বিষক্রিয়া হওয়ার প্রবণতা

ভারতীয় সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে অধিক পরিমাণে ইলিশ খেলে দেহে বিষক্রিয়া হতে পারে। তাদের গবেষণা মতে, এই বিষক্রিয়ার ধরণ অনেকটা অ্যালার্জির মতোই হবে। ইলিশ মাছে রয়েছে হিস্টিডিন নামক এক-প্রকার অ্যামাইনো এসিড যা অধিক পরিমাণে থাকায় এ সমস্যা দেখা দেয়। 

পরিশেষে 

ইলিশ মাছ প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় এই মাছ দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। 

এছাড়াও এর পুষ্টিগুণাগুণ ব্যাপক হওয়ায় এই মাছ খেলে আপনি অবশ্যই উপকারিতা পাবেন। ইলিশ মাছ একসাথে অনেক পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। সুস্বাদু এই মাছের চাহিদা আমাদের দেশে দিন দিন বেড়েই চলেছে। 

তবে আকাশচুম্বী দাম হওয়ার কারণে অনেকেই এ মাছ কিনে খেতে পারেন না। কিছু অসুদপ্রায় জেলে অধিক লাভের আশায় এ মাছ প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগেই ধরে বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে থাকে যা দণ্ডনীয় অপরাধ।

>> মাছের রোগ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন!

শেয়ার করুন-

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top