কোলেস্টেরল কি ? কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা সহ বিস্তারিত জেনে নিন!

কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা নিয়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষজন বরাবরই দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। অনেকেই হয়তো রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ভয়ে বাদ দিয়েছেন প্রিয় অনেক খাবার। মিষ্টি, জাঙ্কফুড, ফাস্টফুড ইত্যাদি খাওয়া থেকেও বিরত রয়েছেন। 

এখন ভাবছেন কি খেলে ক্ষতি হবে না বরং উপকার হবে। আর সেই খাবার যদি হয় সুস্বাদু তাহলে তো কথায় নেই! এমন খাবার নিশ্চয়ই আছে। চলুন আজকের আলোচনায় আমরা কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা নিয়ে আলোকপাত করবো। তবে এর আগে আসুন জেনে নেই কোলেস্টেরল আসলে কি?

কোলেস্টেরল কি ?

কোলেস্টেরল হলো মোম সদৃশ এক ধরণের চর্বি। এই চর্বি মূলত আমাদের দেহের কোষের দেয়ালে থাকে। চর্বিজাতীয় খাবার খাওয়ার ফলে আমাদের যকৃতে কোলেস্টেরল তৈরী হয় এবং তা রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে আমাদের দেহের সমস্ত রক্তনালিতে ছড়িয়ে পড়ে। 

এটি শরীরের প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরিতে, ভিটামিন ডি তৈরিতে এবং চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলো পরিপাকে সাহায্য করে। অধিক পরিমাণ চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়ার ফলে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ধমনির দেয়ালে জমাট বেঁধে আস্তরণ তৈরি করে। যার ধরুণ রক্তনালীর স্বাভাবিক যে রক্তস্রোত তা বাধাগ্রস্ত হয়। 

এর ফলে হৃদপিণ্ডের নানা সমস্যা, হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপের মতো নানারকম শারীরিক সমস্যা দেখা যায়। কোলেস্টেরল কয়েক ধরণের হয়ে থাকে। যেমন: ট্রাইগ্লিসারাইড, এল ডি এল(লো ডেনসিটি লাইপো প্রোটিন), এইচ ডি এল(হাই ডেনসিটি লাইপো প্রোটিন) এবং টোটাল কোলেস্টেরল। 

উপকারী কোলেস্টেরল: কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা

বিভিন্ন ধরণের কোলেস্টেরলের মধ্যে এইচ.ডি.এল শরীরের জন্য উপকারী আর বাকি তিনটি ক্ষতিকর। এল.ডি.এল কোলেস্টেরল ধমনীর দেয়ালে ক্ষতিকর প্লাক তৈরি করে। আর এইচ.ডি.এল. রক্তনালী দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এল.ডি.এল. কোলেস্টেরলকে সরিয়ে দিতে সাহায্য করে। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। এক্ষেত্রে কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা অনুসরণ করলে ভালো ফল লাভ করা যায়।

কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায় কেন?

কোলেস্টেরলের মাএা বেড়ে যাওয়ার জন্য মূলত আমাদের খাদ্যাভাস দায়ী। তাছাড়া আলস্য জীবন যাপন অর্থাৎ কায়িক পরিশ্রম কম করা, ধূমপান, মদ্যপান করা, জর্দা সেবন ইত্যাদি কারণেও সমস্যাটি দেখা দেয়। আর যাদের ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপের মতো রোগ রয়েছে তাদের রক্তেও কোলেস্টেরলের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে স্টেরয়েড, হাইড্রোকোথায়াজাইড জাতীয় ঔষধগুলো রক্তে কোলেস্টেরলের মাএা বাড়িয়ে দেয়।

কোলেস্টেরল থেকে মুক্তির উপায়

কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর তিনটি মূলনীতি রয়েছে। প্রথমত, সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের ব্যবহার সীমিত করুন অর্থাৎ প্রাণীজ উৎপাদিত খাবারগুলো গ্রহণ করা কমিয়ে দিন। এগুলোর পরিবর্তে একক সম্পৃক্ত ফ্যাট এবং বহুবিধ সম্পৃক্ত ফ্যাট গ্রহণ করুন। জলপাই, রেপসিড, সূর্যমুখীর তেল এবং মাছে উপকারী চর্বি পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, কোলেস্টেরল সমৃদ্ধ খাবারের ব্যবহার সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসুন। অবশেষে ফাইবারের ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সবজি ও ফল গ্রহণ করুন। আরো পড়ুনঃ টেস্টোস্টেরন হরমোন বৃদ্ধির উপায় | খাবার,ব্যয়াম, চিকিৎসা এবং ঔষধ সহ বিস্তারিত!

কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা

কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা
ওটমিল বা ভুট্টার তৈরি খাবার:

ভুট্টা বা যবের তৈরি ওটমিল হতে পারে সকালের নাস্তার জন্য উপকারি খাবার। কর্নফ্লেক্সে বিদ্যমান আঁশ অন্ত্রে কোলেস্টেরল শোষণে বাধা প্রদান করে।

বাদাম:

প্রতিদিন বাদাম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একমুঠো বাদাম রক্তে ক্ষতিকর চর্বি ও এল.ডি.এল এর মাত্রা পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে সক্ষম। তাছাড়া বাদামে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যা দেহে সারাদিন শক্তি যোগাবে। আরো পড়ুনঃ কাঠ বাদামের উপকারিতা । নিয়মিত বাদাম খেলে কী হয়?

শিমের বিচি:

শিমের বিচি ও মটরশুঁটিতে বিদ্যমান আঁশ সহজে পেট ভরার তৃপ্তি দেয়। ফলে তুলনামূলক কম খাবার খাওয়া হয়।

জলপাইয়ের তেল বা জলপাইয়ের তৈরি খাদ্য:

জলপাইয়ের তেলে রয়েছে ভিটামিন-ই ও মনো-আনসেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড। মনো-আনসেচোরেটেড ফ্যাটি এসিড দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিমাণ হ্রাস করে এবং উপকারী কোলেস্টেরল এইচ.ডি.এল এর বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই রক্তে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়াতে ও খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে প্রতিদিন ১/২ চামচ জলপাইয়ের তেল বা জলপাইয়ের তৈরি খাবার খাওয়া আবশ্যক। আরো পড়ুনঃ অলিভ অয়েল তেলের উপকারিতা – ১৯ স্বাস্থ্যকর টিপস

অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফল ও সবজি:

ভিটামিন -সি ও বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ সবজি বেশি পরিমাণে খেতে হবে। সাইট্রাস ও বেরি জাতীয় ফল অর্থাৎ কমলা, গ্রেপফল, লেবু, ক্র্যানবেরি, স্ট্রবেরি, ব্লাকবেরি ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি রয়েছে। অন্যদিকে গাঢ় হলুদ ফলে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন। যেমন: আমা,হলুদ পিচফল, কাঁঠাল ইত্যাদি। গাজর, মিষ্টিআলু, কুমড়া, কাঠবাদাম ইত্যাদির মধ্যেও বিটা ক্যারোটিন রয়েছে। এছাড়া পাতাকপি, ব্রকোলির মতো গাঢ় সবুজ সবজি শরীরের বিটা ক্যারোটিনের চাহিদা পূরণ করে।

রসুন ও পেঁয়াজ জাতীয়:

রসুন, পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ জাতীয় খাবার শরীরে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিমাণ হ্রাস করে। তরকারি ও সালাদে এসবের ব্যবহার হৃদপিণ্ডকে ভালো রাখতে সাহায্য করে। আরো পড়ুনঃ রসুন এর উপকারিতা – ১১ টি গুণাগুণ জেনে নিন!

মাছ:

উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্তদের জন্য মাছ খুবই উপকারী। সপ্তাহে ৩/৪ দিন মাছ খাওয়ার অভ্যাস শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হ্রাস করতে ভূমিকা রাখে। মাছে রয়েছে হাই ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড জাতীয় খাদ্য:

ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি প্রচুর পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড ব্যবহার করা হয়। যেমন: জলপাই, ওয়ালনাট, শিমজাতীয় খাদ্য ইত্যাদি। কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা তে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড জাতীয় খাদ্যের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

তৈলাক্ত সামুদ্রিক মাছ:

সপ্তাহে ২/৩ দিন তৈলাক্ত সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

এতক্ষণে আমরা কোলেস্টেরল সম্পর্কিত তথ্য ও কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা সম্পর্কে বিশদ ধারণা লাভ করলাম। রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের কর্মঠ জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভাসের কোন বিকল্প নাই। সেইসাথে উপরোক্ত খাদ্য তালিকা অনুসরণ করে আমরা বিরাট স্বাস্থ্যঝুঁকির হাত থেকে রেহাই পেতে পারি।

লেখকঃ সৈকত

ট্যাগঃ কোলেস্টেরল কি, কোলেস্টেরল থেকে মুক্তির উপায়, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে খাদ্য তালিকা, কোলেস্টেরল কমানোর খাদ্য তালিকা

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *