গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ । আলসার ভালো করার উপায় সহ বিস্তারিত!

গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ প্রকাশ পেলেও অনেকেই তা সাধারণ গ্যাস্ট্রিক ভেবে এড়িয়ে যান, এবং পরবর্তীতে অনেক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। এজন্য গ্যাস্ট্রিক আলসার সম্পর্কে সকলের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। গ্যাস্ট্রিক আলসার মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পেপটিক আলসার হিসেবে পরিচিত। 

পেপটিক আলসার হলে পেটের ওপরের দিকে সবসময় অল্প অল্প ব্যথার পাশাপাশি হঠাৎ তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয় এবং বদহজম দেখা দেয়। খাবারের অনিয়ম কিংবা দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকলে পেপটিক আলসার দেখা দিতে পারে। পেপটিক আলসার শুধু পাকস্থলীতেই হয় তা নয় বরং এটি পৌষ্টিকতন্ত্রের যেকোনো অংশেই হতে পারে।

পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরী হবার ফলে পেপটিক আলসার হয়ে থাকে। কেননা অতিরিক্ত অ্যাসিড পাকস্থলীর মিউকোসার পর্দা নষ্ট করে ফেলে এবং পাকস্থলীর সংস্পর্শে এসে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এবং হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়াও মিকোসাল পর্দা নষ্ট করে ফেলে, অ্যাসিডকে পাকস্থলীর সংস্পর্শে এনে প্রদাহের সৃষ্টি করতে সাহায্য করে।

এছাড়াও পৌষ্টিকতন্ত্র থেকে অতিরিক্ত অ্যাসিড এবং পেপসিন নামক এক ধরনের পরিপাককারী এনজাইমের নিঃসরণের ফলে পেপটিক আলসার হতে পারে। আবার কখনো কখনো জন্মগত ভাবে পৌষ্টিকতন্ত্রের কাঠামো দুর্বল থাকলেও পেপটিক বা গ্যাস্ট্রিক আলসার হয়ে থাকে।

আসুন জেনে নেয়া যাক পেপটিক বা গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ, এবং চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিতঃ

গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ

আলসার রোগের লক্ষণ : 

গ্যাস্ট্রিক বা পেপটিক আলসারের সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ রয়েছে যেগুলো প্রকাশ পেলে সহজেই রোগটি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এবং গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের নিকটস্থ হতে হবে। যেমনঃ

১. পেটের ওপরে মৃদ ব্যথার পাশাপাশি কখনো কখনো তীব্র ব্যথা শুরু হয় এবং খাওয়ার পরে ব্যথা আরো বেড়ে যায়।

২. বুক জ্বালাপোড়া করে।

৩. ক্ষুধামন্দা হয় এবং ওজন হ্রাস পায়।

৪. অতিরিক্ত হেঁচকি আসতে থাকে।

৫. বমি বমি ভাব থাকে, কখনো কখনো বমি হয়ে যায়।

৬. টক বা তিক্ত ঢেকুর উঠতে থাকে।

৭. মেরুদণ্ডে ব্যথা অনুভূত হয়।

>> গ্যাস্ট্রিক কমানোর উপায় – লক্ষণ সমূহ ও ঘরোয়া চিকিৎসা জেনে নিন!

আলসার হলে করণীয় : 

পেপটিক বা গ্যাস্ট্রিক আলসার তেমন জটিল কোনো রোগ নয় এবং চিকিৎসা পদ্ধতি আধুনিক হওয়ায় সহজেই এখন এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা গ্রহণের সাথে সাথে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে খাদ্যাভাসে যে পরিবর্তনগুলো আনতে হবে সেগুলো হলো-

১. ভাজাপোড়া এবং মশলাযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে।

২. ধুমপান এবং অ্যালকোহল বর্জন করতে হবে।

৩. ফাস্টফুড জাতীয় খাবার এবং কোমল পানীয় পরিহার করতে হবে।

৪. ভিটামিন-এ, এবং সি, ই জাতীয় ফলমূল ও শাকসবজি বেশি বেশি খাবার অভ্যেস গড়ে তুলতে হবে।

৫. ক্যাফেইনযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

৬. প্রতিদিন শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে ইত্যাদি। 

আলসার ভালো করার উপায় : 

অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং জীবন যাপনের কারণে অনেকেই আলসারের সমস্যায় ভুগে থাকেন। বিশ্বের ২ দশমিক ৪ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ আলসারের সমস্যায় ভুগছেন। পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক আলসার প্রাথমিক অবস্থায় সহজেই সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়। আবার কখনো কখনো মারাত্মক আকার ধারণ করলে অপারেশনের শরণাপন্ন হতে হয়। এক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ প্রকাশ পেলে শুরুতেই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। এবং খাবারে অনিয়ম পরিত্যাগ করতে হবে। সময়মত খাবার খাওয়ার পাশাপাশি সচেতন জীবন-যাপন করতে হবে।

আলসার হলে কি কি খাওয়া যাবে না : 

পেপটিক আলসার বা পাকস্থলীর আলসার হলে খাবার গ্রহণে সচেতন থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে এমন কিছু খাদ্য রয়েছে যেগুলো অবশ্যই বর্জন করতে হবে। পেপটিক আলসারে বর্জনীয় খাবারগুলো হলোঃ

১. কফি বা ক্যাফেইন সমৃদ্ধ খাবার 

২. অতিরিক্ত মশলা বা ঝাল জাতীয় খাবার 

৩. লাল জাতীয় মাংস অর্থাৎ গরু,খাসী ইত্যাদির মাংস

৪. দুধ ও দুগ্ধ জাত খাদ্য ইত্যাদি 

আলসার হলে কী লেবু খাওয়া যাবে : 

অনেকেই মনে করেন লেবুতে অ্যাসিডিটি বেড়ে যায় এবং গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ দেখা দিলে লেবু বর্জন করেন। তবে এটি একটি ভুল ধারণা। লেবু অ্যাসিডিটি বাড়ায় না বরং কমাতে সাহায্য করে। লেবুতে রয়েছে সাইট্রিক এসিড যা পাকস্থলীর সোডিয়াম, পটাশিয়াম ইত্যাদি লবণের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম সাইট্রেট, পটাশিয়াম সাইট্রেট ইত্যাদি যৌগ তৈরি করে। এবং পাকস্থলী থেকে ক্ষরিত হয় হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড। 

এই হাইড্রোক্লোরিকের কারণে বুক-জ্বালা, গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি হয়ে থাকে।  এক্ষেত্রে ক্ষারধর্মী সোডিয়াম সাইট্রেট যৌগটি অতিরিক্ত হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। এতে করে আর বদহজম হয় না। সুতরাং লেবু হজমে সাহায্য করে। অর্থাৎ পেপটিক বা গ্যাস্ট্রিক আলসার হলে লেবু খাওয়া যাবে।

পেপটিক আলসার রোগীর খাবার : 

পেপটিক আলসার মূলত এক ধরনের ঘা বা ক্ষত জনিত রোগ। তবে পেপটিক আলসার সহজেই নিরাময় সম্ভব।এইজন্য রোগীকে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি সঠিক খাদ্য নির্বাচন করতে হবে। পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগীর জন্য উপকারী খাবারসমূহ হলোঃ

ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার :

ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণে পেপটিক আলসারের ঝুঁকি অনেক কমে আসে। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার অ্যাসিড কমাতে সাহায্য করে। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার যেমনঃ ওটস, মিষ্টি আলু, আপেল, ডুমুর, ব্রকলি, গাজর ইত্যাদি প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।

ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার :

ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার আলসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি আলসারের ক্ষত সারাতে সহায়তা করে থাকে। পেপে, আম,মিষ্টি আলু, গাজর, কুমড়া,পালংশাক, রেড বেল পিপার প্রভৃতি ভিটামিন-এ জাতীয় খাবার প্রতিদিন খেতে হবে।

ফ্লাভোনয়েড সমৃদ্ধ খাবার :

ফ্লাভোনয়েড সমৃদ্ধ খাবার গ্রীন টি, আদা, রসুন, পেয়াজ, রঙিন শাকসবজি এবং ফল নিয়মিত গ্রহণে আলসারের ক্ষত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। 

প্রো-বায়োটিক খাবার :

দই, মিসো, খিমচি প্রভৃতি প্রো-বায়োটিকযুক্ত খাদ্য দ্রুত আলসারের ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে।

পেপটিক আলসার রোগের চিকিৎসা : 

পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক আলসার সহজেই নিরাময়যোগ্য। এজন্য অবহেলা না করে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা আবশ্যক। তবে সময়মত চিকিৎসা গ্রহণ না করলে নানারকম জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে। কখনো কখনো পাকস্থলী ফুটো হয়ে যেতে পারে এবং রক্তবমি হতে পারে। তাই গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ প্রকাশ পেলেই চিকিৎসকের নিকটস্থ হতে হবে। সাধারণত প্রাথমিক অবস্থায় অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ সেবনে রোগীরা উপকৃত হয়ে থাকেন।

তবে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ গ্রহণের পরও যদি রোগী ভালো না হয়, এবং খাদ্য গ্রহণের সাথে সাথে বমি হয়ে যায়,  অর্থাৎ পৌষ্টিক নালির কোনো অংশ যদি সরু হয়ে পড়ে, সে ক্ষেত্রে অপারেশনের পথ বেছে নিতে হয়। এবং এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়।

সুতরাং পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক আলসার অতি সাধারণ একটি রোগ। তাই এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে সচেতন থাকতে হবে। এবং সুস্থ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে হবে। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস বর্জন করতে হবে। গ্যাস্ট্রিক আলসার এর লক্ষণ প্রকাশ পেলেই গ্যাস্ট্রিক ভেবে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এবং মনে রাখতে হবে প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই পেপটিক বা গ্যাস্ট্রিক আলসার হতে পারে এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। 

Writer: Rubi Manjuman Mou

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *