চিয়া সিড এর অপকারিতা

চিয়া সিড এর অপকারিতা ও অজানা কিছু তথ্য!

চিয়া সিড মরুভূমিতে জন্মানো সালভিয়া উদ্ভিদের বীজ। এই বীজের আদি জন্মস্থান সেন্ট্রাল আমেরিকারতে। প্রাচীন অধিবাসীদের খাদ্য হিসেবে এই বীজ ছিলো খাদ্য তালিকায়। সেন্ট্রাল আমেরিকার প্রাচীন অধিবাসীদের কাছে সোনার চেয়েও মূল্যবান ছিলো এই বীজ। তবে চিয়া সিড এর অপকারিতা সম্পর্কে না জানলেই নয়। 

চিয়া সিড দেখতে তিলের মতো। সাদা ও কালো উভয় রঙের হয়। এই বীজের ভালো একটি গুণ হলো, সব ধরনের আবহাওয়ায় হয়। পোকামাকড় সহজে আক্রমণ করতে পারে না। অনেকেই চিয়া সীডকে ব্যাসিল সিড বা তোকমার সাথে গুলিয়ে ফেলে। কিন্তু চিয়া সিড তোকমার চেয়ে আকারে ছোট হয়।

ভিডিওঃ চিয়া সিড খাওয়ার বেশ কিছু নিয়ম ও উপকারিতা জানুন | Benefits of chia seeds

এতদিন আমরা চিয়া সিড নামটাই শুনে গেলাম আজকে আসুন চিয়া সিড সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু তথ্য জেনে নিইঃ

চিয়া সিড কী – চিয়া সিড এর অপকারিতা

চিয়া সিড হলো সালভিয়া হিস্পানিকা বা চিয়া উদ্ভিদের অন্তর্ভুক্ত। যা পুদিনা পরিবারের একটি প্রজাতি। চিয়া সিডের বীজটি মধ্য আমেরিকার অনেক অংশে পাওয়া যায়। একে এক ধরণের ভেষজও বলা হয়। যা সাম্প্রতিক সময়ে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চিয়া সিড স্বাভাবিকভাবেই শস্যের শ্রেণিতে পড়ে। চিয়া সিডে রয়েছে অনেক পুষ্টিকর উপাদান।

উদাহরণস্বরূপ, এক গ্লাস দুধের চেয়ে বেশি ক্যালসিয়াম, বাদামের চেয়ে বেশি ওমেগা -3 এবং অনেক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপস্থিত । যা ব্যক্তিকে প্রচুর পরিমাণে শক্তি সরবরাহ করে।

চিয়া সিড এর অপকারিতা

চিয়া সিডের স্বাস্থ্য উপকারিতা পাশাপাশি রয়েছে কিছু অপকারিতা। সেগুলো সম্পর্কে জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নাহলে অতিরিক্ত চিয়া সিড খাওয়া স্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। নিচে চিয়া সিড এর অপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হলোঃ

১. চিয়া সিড প্রোটেস্ট ক্যান্সার এবং স্তন ক্যান্সারকে বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। সুতরাং এটি সীমিত পরিমাণে ব্যবহার করা উচিত।

২. চিয়া সিড বেশি খাওয়ার ফলে পেটের সমস্যা হতে পারে। কারণ চিয়া সিডের মধ্যে আছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার। তাই অল্প পরিমাণে চিয়া সেবন করুন।

৩. অতিরিক্ত পরিমাণে চিয়া সীড খাওয়ার কারণে ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। এর প্রভাবে দেহে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। তাই অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়।

৪. চিয়া সিড দেহের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে রক্তচাপ কমায়। প্রয়োজনের তুলনায় পরিমাণে বেশি চিয়া বীজ সেবন করলে রক্তচাপ বেশি কমে যেতে পারে।

৫. চিয়া সিড বেশি খেলে এলার্জি জনিত সমস্যা হতে পারে। এ সমস্যা থেকে অনেকের গ্যাস্ট্রিক সমস্যা সহ শরীর ফুলে যাওয়া, বাতের ব্যথা এসকল সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

৬. চিয়া সিডে রয়েছে প্রচুর পরিমান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।যারফলে বেশি পরিমাণে চিয়া সিড গ্রহণ করলে বমি, উদরাময়, মাথা ব্যথা হতে পারে।

৭. চিয়া সিডে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন। অতিরিক্ত প্রোটিন হিতের বিপরীত হতে পারে। বেশি প্রোটিন শরীর ওজন বাড়িয়ে দেয়। 

চিয়া সিড কোথায় পাওয়া যায়?

চিয়া সিড  বাংলাদেশে সহজপ্রাপ্য নাহলেও বর্তমানে বাংলাদেশ এটি আমদানি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বড় বড় দোকান বা সুপারশপে এই চিয়া সিড পাওয়া যায়।

এছাড়াও দেশের বিভিন্ন অনলাইন শপেও এই বীজ পাওয়া যায়। পুষ্টিকর ও উপকারী চিয়া সিড চাইলে আপনারা অনলাইন থেকেও কিনতে পারেন। দারাজ, পিউর স্টোর, কৃষকবাজার, মাই অর্গানিকবিডি ইত্যাদির মতো অনলাইন স্টোর থেকে চাইলে সহজেই চিয়া সিস কিনতে পারেন। দামের তারতম্য হলেও সঠিক ভাবে বাছাই করে ভালো মানের কেনাই ভালো। কারণ এই চিয়া সিডের পুষ্টিমান অত্যন্ত উচ্চমানের।

চিয়া সিড এর দাম

এক কেজি চিয়া বীজ বা সিড এর দাম ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। আর খুচরা হিসেবে কিনলে ১০০ গ্রাম চিয়া বীজের দাম পড়বে ৮০ থেকে ১০০ টাকা।

আবার কোনো দোকানে ভিন্ন দামেও পাওয়া যায়। কোথাও দাম বেশি আবার কোথাও কম। মূলত ব্যাপক পরিসরে এর চাষাবাদের শুরু না হওয়ায় এটি সব জায়গায় সমান দামে পাওয়া যায় না। যারফলে দামের তারতম্য থেকেই যায়।

চিয়া সিড কেন খাবেন?

মূলত চিয়া সিডে রয়েছে প্রচুর ফাইবারের উপাদান। যা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে দূর করে। এ ছাড়াও রয়েছে ফ্যাট ও প্রোটিন। শরীরের কোষকে রক্ষা করার মতো অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট। চিয়া সিড রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। হৃদ্‌যন্ত্রের রোগ থেকেও বাঁচাতে পারে এই চিয়া সিড। পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণ  এই খাবারও অন্য যেকোনো খাবারের তুলনায় খাওয়া আমাদের স্বাস্থ্য জন্য ভালো।

চিয়া সিড এর উপকারিতা

১.শর্করা নিয়ন্ত্রণ 

চিয়া সীড ব্লাড সুগার স্বাভাবিক রাখে। ফলে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কমায়। অর্থাৎ চিয়া সিডে এমন অনেক পুষ্টি রয়েছে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস করতেও সহায়তা করে। যা শরীরে ইনসুলিন তৈরিতে সহায়তা করে।এর ফলে শরীরে শর্করার মাত্র স্বাভাবিক থাকে।

২. ওজন কমাতে সাহায্য করে

চিয়া সিড ওজন কমাতে সহায়তা করে। যদি কোন ব্যক্তি ওজন হ্রাস করার চেষ্টা করে, তার জন্য চিয়া  সীড খুব উপকারী। এতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে। যা ফ্যাট কমাতে সহায়তা করে। ফাইবার প্রচুর পরিমান পানি শোষণ করে। এতে আপনার পেট ভরা ভরা মনে হবে।

৩. হাড়ের সুস্থতা

চিয়া সিড রয়েছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস। যা আমাদের হাড়ের সুস্থতা নিশ্চিতে সাহায্য করে।

৪. শক্তি বৃদ্ধি

চিয়া সিডে প্রাকৃতিকভাবে অনেক খনিজ এবং ভিটামিন থাকে। যা শরীরে শক্তি জোগায়। এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

৫.প্রোটিন চাহিদা পূরণ

চিয়া সীডে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন। যা আমাদের দেহের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও উপকারী। মাছ মাংস থেকে বেশি প্রোটিন আমরা চিয়া সীড থেকে আহরন করে থাকি।

চিয়া সিড খাওয়ার নিয়ম

সুপারফুড হিসেবে খ্যাত চিয়া সিড নানা ভাবে খাওয়া যায়। চলুন এ পর্যায়ে চিয়া সিড খাওয়ার বিভিন্ন উপায় সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-

১. স্মুথি বানিয়ে

চিয়া খাওয়ার সবে চেয়ে জনপ্রিয় উপায় হচ্ছে স্মুথি বানিয়ে খাওয়া। আপনি চাইলে টক দই, চিয়া সিড, ও শসা দিয়ে স্মুথি বানিয়ে খেতে পারেন। আবার ব্লেন্ডার এর সাহায্যে কলা, খেজুর, বাদাম ও চিয়া বীজ এর স্মুথি বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

২. সালাদ বানিয়েঃ

অবাক হয়ে গেলেন, চিয়া সিডের আবার সালাদ হয় নাকি। অবাক হয়ার কিছু নেই। আপনি চাইলে বাসায় যে রেগুলার সালাদ বানান তার সাথে পরিমান মত চিয়া বীজ নিয়ে নিতে পারেন।

৩. ড্রিংকস

কোমল কিংবা হার্ড ড্রিংকস এর কথা বলছি না। চিয়া ড্রিংকস এর কথা বলছি। ২ কাপ পরিমান নারিকেলের পানি বা পছন্দ মতো ফলের রসের সাথে ২ থেকে ৩ টেবিল চামচ চিয়া সিড দিয়ে মিশ্রন বানিয়ে নিন। প্রয়োজনে পানিও যোগ করতে পারেন।

৪. জেলি হিসাবে

স্বাদ ও ঘ্রাণহীন হয়ে থাকে বলে অনেক দেশে রুটির সাথে এটি খাওয়া হয়।

৫. মসলা হিসাবে

অনেকে সকালে খিচুড়ি রান্না করার সময় বা তরকারি রান্নার চিয়া সিড ব্যবহার করে থাকেন। স্বাদ এবং ঘ্রাণহীঙ হওয়ার জন্য এটি তরকারি বা খিচুড়ি সাথে খাওয়া যায়।

৬. শরবত

সকালে ঘুম থেকে উঠার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে ১ গ্লাস পানির মধ্যে ২ চা চামচ চিয়া সিড ও ২ চামচ লেবুর রস মিশিয়ে খেতে পারেন। খাওয়ার ৩০মিনিট আগে নরমাল পানিতে চিয়া সিড ভিজিয়ে রাখতে হবে।

বাচ্চাদের চিয়া সিড খাওয়ার নিয়ম

শিশু এবং কিশোরদের জন্য চিয়া সিড কোনও প্রস্তাবিত দৈনিক সীমা নেই। আপনি খাবারের জন্য প্রতিদিন এক চা চামচ ভিজানো চিয়া সিড যোগ করতে পারেন। আবার আপনি যেভাবে খাবেন সেইভাবেও বাচ্চাদের খাওয়াতে পারেন।

চিয়া সিড খাওয়ার সময়

প্রতিদিন সকালে এবং বিকেলে খালি পেটে চিয়া সিড খেতে পারেন। তবে খাওয়ার আগে অবশ্যই এক থেকে দেড় ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে।

এছাড়াও আপনি যদি শরীরের বাড়তি ওজন দ্রুত কমিয়ে ফেলতে চান।তাহলল প্রতিদিন সকালে এবং বিকেলে চিয়া সিড লেবুর রস মিশিয়ে খেতে পারেন। ওজন দ্রুত কমাতে এটা বেশ উপকারী ।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন  চিয়া সিড খাওয়ার  উপযুক্ত সময় হল সন্ধ্যাবেলা। ইভিনিং স্ন্যাকস হিসেবে দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে পারেন। এতে পেটও ভরবে আবার শরীরও থাকবে সুস্থ।

চিয়া সিড এর পুষ্টিগুণ

চিয়া সিডে রয়েছে দুধের চেয়ে ৫ গুণ বেশী ক্যালসিয়াম, কমলার চেয়ে ৭ গুণ বেশি ভিটামিন সি, পালংশাকের চেয়ে ৩ গুণ বেশী আয়রন (লোহা), কলার চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম, ও মাছের থেকে ৮ গুণ বেশী ওমেগা-৩।

এতে আরো আছে উচ্চমাত্রার এন্টিঅক্সিডেন্ট। যা ত্বক ও দেহের অভ্যন্তরীণ কোষ রক্ষণাবেক্ষণে বেশ উপকারি ৷ এছাড়াও চিয়া সিডে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন। প্রোটিন আমাদের দেহের জন্য অত্যন্ত উপকারি। 

স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী অনেক উপাদান চিয়া সিডে আছে। চিয়া সিডে রয়েছে শর্করা, ফাইবার, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, দস্তা, তামা, পটাশিয়াম, প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড,লিনোলিক অ্যাসিড, পাশাপাশি রয়েছে  ভিটামিন এ, বি, ই, ডি এবং সালফার, আয়রন, আয়োডিন, ম্যাগনেসিয়াম, নিয়াসিন, থায়ামিন সহ খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যা আমাদের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।

পরিসমাপ্তি  

চিয়া সিড হলো সবচেয়ে পুষ্টিকর এবং সাস্থ্যকর খাবারের মধ্যে একটি অন্যতম খাবার। চিয়া সিড অন্য খাবারের থেকে বেশি পুষ্টি গুণ সম্পন্ন খাবার। এইজন্য চিয়া সিড পরিমাণ মতো খাওয়া উচিত। বেশি পরিমাণে  খাওয়া স্বাস্থ্যর জন্য  ক্ষতিকর। তাই পরিপূর্ণ উপকার পেতে নিয়ম নির্দিষ্ট পরিমাণে চিয়া সিড সেবন করুন।

 আপনার মনে কোন প্রশ্ন থাকলে এখানে করুন!

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top