টুনা মাছ এর ১০ টি স্বাস্থ্য উপকারিতা জেনে নিন!

লোনা পানিতে বসবাসের কারণে টুনা মাছ আমাদের সকলের কাছে হয়ত অতটা পরিচিত নয়। তবে জনপ্রিয় এই মাছগুলো এশিয়ান খাবারের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের অন্যান্য মহাদেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এগুলো সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাঁচে, তবে কিছু কিছু টুনা মাছ প্রায় দুই দশক পর্যন্ত বাঁচতে পারে। 

টুনা মাছ

এগুলি তুলনামূলকভাবে ধরা সহজ। স্টেক, বার্গার এর মতো সুস্বাদু খাবার তৈরি এই মাছ ব্যবহৃত হয়। টুনার আটটি প্রজাতি রয়েছে, যার সবগুলিই যাযাবর, যার অর্থ হল তারা স্থানান্তরিত হয় এবং একই জায়গাতে বেশিদিন থাকে না। ক্রমাগত শিকার করার কারণে এগুলো অনেক জায়গাতে বিপন্ন প্রাণীর তালিকাভূক্ত।

টুনা মাছ ওমেগা-3 ফ্যাটি অ্যাসিড, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন এ, বি এর মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টির পাওয়ারহাউস হওয়ার কারণে স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

টুনা মাছ- পুষ্টি উপাদান

এই মাছ ভিটামিন ডি এর অন্যতম সেরা উৎস। এছাড়া অন্যান্য ভিটামিন ও মিনারেলস্ এর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি6 ও বি12, আয়রন, পটাশিয়াম, সেলেনিয়াম, আয়োডিন ইত্যাদি। একটি সাদা টুনার 4 আউন্স থেকে প্রায় 145 ক্যালোরি, 26.77 গ্রাম প্রোটিন, 3.37 গ্রাম চর্বি পাওয়া যায়।

এগুলো ছাড়াও এতে আছে আরো অনেক প্রকার পুষ্টি উপাদান। তবে এতে কোন কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার বা সুগার নেই।

টুনা মাছের স্বাস্থ্য উপকারিতা

পুষ্টি উপাদানে ভরপুর হওয়ার কারণে টুনা মাছের স্বাস্থ্য উপকারিতা অনেক বেশি। নীচে এর উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো।

হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে

টুনা মাছ হৃদরোগের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে। এই মাছে ওমেগা-3 ফ্যাটি এসিড উচ্চ মাত্রায় রয়েছে, যা এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল এর মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

তাছাড়া এগুলো প্রায়শই উচ্চ মাত্রার স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাদ্যকে প্রতিস্থাপন করে। ফলে হার্টের রোগের ঝুঁকি আরো কমে যায়। 

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে

প্রদাহ বিরোধী ওমেগা-3 ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। টুনাতে পাওয়া পটাসিয়াম একটি সম্ভাব্য ভ্যাসোডাইলুটর এবং রক্তচাপ কমাতে খুব ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ হ্রাস করার মাধ্যমে আপনার কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমে চাপ কমিয়ে আনে এবং স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি করতে পারে।

এটি হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক এবং সেইসাথে এথেরোস্ক্লেরোসিসের মতো অবস্থাকে প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে।

চোখের যত্নে উপকারী

ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের মতো চোখের রোগ বয়স্কদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়। টুনা মাছে থাকা ওমেগা-3 ফ্যাটি অ্যাসিড এই রোগ প্রতিরোধে চমৎকার ভূমিকা রাখতে পারে এবং বয়স্ক মানুষের অন্ধত্বের ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে।

ডায়াবেটিক জটিলতার কারণেও অন্ধত্ব হয়, ‍টুনা মাছ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করতে পারে। 

শরীরে শক্তি যোগায়

উচ্চ মাত্রার প্রোটিনে ভরপুর 165 গ্রাম টুনা মাছ আপনার দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজনের 80% এরও বেশি সরবরাহ করতে পারে। প্রোটিন হল আমাদের শরীরের বিল্ডিং ব্লক যা বৃদ্ধির গ্যারান্টি দিতে পারে।

ক্ষত এবং অসুস্থতা থেকে শরীরকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পারে। পেশী উন্নত করতে পারে এবং সামগ্রিক বিপাকীয় দক্ষতা অর্জনের জন্যও প্রোটিন প্রয়োজন। 

>> কোন মাছে কত প্রোটিন | জেনে নিন প্রোটিন যুক্ত মাছের তালিকা!কোন মাছে কত প্রোটিন | জেনে নিন প্রোটিন যুক্ত মাছের তালিকা!

ওজন কমাতে সাহায্য করে

টুনা মাছে ক্যালোরি খুবই কম এবং চর্বি প্রায় নেই বলা যায়। এতে থাকা ওমেগা-3 ফ্যাটি অ্যাসিড লেপটিন নামক হরমোনকে উদ্দীপিত করে। যে কারণে খাদ্য গ্রহণের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং বেশি খাওয়ার আকাংখা কমে যায়।

অতিরিক্ত খাওয়া কমিয়ে এটি নিশ্চিত করে যে শরীরের জন্য যা প্রয়োজন শুধুমাত্র তাই গ্রহণ করে। তাছাড়া বর্ধিত লেপটিন ওজন হ্রাসের পরে ওজন ফিরে পেতে বাধা দেয়। তাই নিয়মিত টুনা মাছ খাওয়ার মাধ্যমে ওজন কমানোর প্রক্রিয়া আরো দ্রুত কার্যকর হতে পারে।

ইমিউন সিস্টেম উন্নত করে

টুনাতে ভাল পরিমাণ ভিটামিন সি, জিংক এবং ম্যাঙ্গানিজ রয়েছে। এগুলো সবই প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে বিবেচিত হয়। এগুলো শরীরে থাকা ফ্রি-র‌্যাডিকেলকে নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমে কোষের ক্ষতি হওয়া রোধ করে। তবে রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে এই মাছে থাকা সেলেনিয়াম। এটি খুব শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। 

রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে

টুনা মাছে রয়েছে প্রচুর পরিমান আয়রন এবং ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। এগুলো লোহিত রক্ত কণিকা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আয়রণ ব্যতীত মানুষ রক্তশূন্য হয়ে পড়ে এবং রক্ত ​​গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিকে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন পৌছে দিতে অক্ষম হয়। টুনা মাছ এই সমস্যা দূর করতে রক্ত সঞ্চালনকে উন্নত করে।

ক্যান্সার প্রতিরোধ করে

এই মাছ বিভিন্ন ধরণের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানে পূর্ণ থাকার কারণে ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। তাছাড়া একটি রিসার্চে দেখা যায় টুনা মাছে থাকা ওমেগা-3 ফ্যাটি অ্যাসিড কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। 

কিডনি ভাল রাখে

টুনা মাছে সুষম পরিমাণ পটাসিয়াম ও সোডিয়াম রয়েছে, এটি শরীরে তরলের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। তরলের ভারসাম্য ঠিক থাকলে কিডনি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে। ফলে কিডনি ভাল থাকে এবং গুরুতর কিডনিরোগের সম্ভাবনা কমে যায়। 

তবে যারা বিভিন্ন কিডনি রোগে আক্রান্ত তারা অবশ্যই এটি খাওয়ার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিবেন। কারণ টুনা মাছে থাকা পটাসিয়াম এবং ফসফরাস কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বিষাক্ত হতে পারে।

ত্বক ভাল রাখে

টুনা মাছ ত্বক ভাল রাখতে সহায্য করে। এতে থাকা ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ত্বককে সুস্থ্য ও লাবন্যময় করে তোলে। এতে ইলাস্টিন নামক একটি প্রোটিন রয়েছে যা আমাদের ত্বকে মসৃণ স্তর দেয়। নিয়মিত টুনা মাছ খাওয়ার মাধ্যমে আপনি সহজেই উজ্জ্বল ত্বক পেতে পারেন। 

টুনা মাছ খাওয়াতে সতর্কতা

এই মাছ খাওয়ার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো এতে থাকা পারদ। এটি একটি ভারি ধাতু যা পানি দূষণের কারণে বিভিন্ন মাছের মধ্যে থাকে। এর মধ্যে টুনা মাছে একটু বেশি পরিমাণে থাকে কারণ এই মাছগুলো অন্যান্য অনেক ছোট মাছ খায়। গবেষণায় দেখা যায় উচ্চ মাত্রার পারদ স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিবন্ধকতা সহ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। 

বড়দের ক্ষেত্রে এই মাছ প্রতি সপ্তাহে 4 আউন্স বা 113 গ্রাম পর্যন্ত সুপারিশ করা হয়। পারদ বাচ্চাদের স্নায়ুতন্ত্রের জন্য বেশ ক্ষতিকর। তাই 2 থেকে 10 বছর বয়সের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনবার 1 আউন্স পরিমান (28 গ্রাম) টুনা মাছ  দেওয়া যেতে পারে। 

গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ানো মহিলাদের পারদ আছে এমন মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পরেও তাদের সপ্তাহে 4 আউন্স পরিমাণ টুনা মাছ খেতে পারবেন।

শেষ কথা

যদিও টুনা মাছ পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ, তবুও এটি খাওয়ার ব্যাপারে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। তবে পরিমিত মাত্রায় এই খাওয়ার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্য উপকারিতা ‍পেতে পারি। ভিটামিন ডি এবং সেলেনিয়ামের মতো উপাদান যেমন টুনা মাছে আছে, যেগুলো খুবই উপকারি উপাদান।

আবার পারদের মতো ভারি ধাতুও রয়েছে যা ক্ষতিকর। তাই এই মাছ থেকে উপকার পেতে অবশ্যই পরিমিত মাত্রায় খাওয়া উচিৎ। 

>> সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার ১০ টি উপকারিতা!

শেয়ার করুন-

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top