ডি গিয়া

ডি গিয়াঃ এক স্প্যানিশ গ্ল্যাডিয়েটর!

crickex banner ad

২০১১ সাল, কমিউনিটি শিল্ডের খেলা চলছে। মুখোমুখি দুই নগর প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেষ্টার সিটি। ইউনাইটেডের ডাগ আউটে দাঁড়িয়ে সেই চশমা পরিহিত বুড়ো, স্যার আলেক্স ফার্গুসন। মুখে অনবরত চিবিয়ে চলেছেন চুইংগাম, তার ট্রেড মার্ক। তবে আজ যে মুখ অনবরত নড়ছে, খুব দ্রুত! ঘটনা কি! তার দৃষ্টি ঘন ঘন যাচ্ছে একদিকেই, নিজেদের গোলপোস্টে। 

সেখানে দাঁড়িয়ে বছর বিশ পার করা এক তরুণ, ‘ডেভিড ডি গিয়া'(উচ্চারণঃ দাবিদ দি হেয়া)। রেকর্ড ১৮.৯ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে সাইন করিয়েছেন তিনি, যার জন্যে আগ্রহ দেখিয়েও সাইন করাননি জার্মান জায়ান্ট শালকের ম্যানুয়েল ন্যুয়ারকে। আস্থার প্রতিদান দিতে পারবে তো ছেলেটা?

২০১১ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লিজেন্ডারি গোলরক্ষক ‘এডউইন ভ্যান ডার সার’ ঘোষণা দেন, তিনি এই সিজন শেষে রিটায়ার করবেন। যদিও ইউনাইটেড ম্যানেজমেন্ট আগে থেকেই জানত রিটায়ারমেন্ট এর ঘোষণা আসবে। তাই ঘোষণার আগেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড খোঁজা শুরু করে দিয়েছিল ভ্যান ডার সার কে রিপ্লেসমেন্টের। 

বেশ জোড়ালো গুঞ্জন ও জল্পনা-কল্পনা চলছিল যে, শালকের ২৫ বছরের ম্যানুয়েল ন্যুয়ার হতে পারেন ইউনাইটেডের নেক্সট নাম্বার ওয়ান। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন মনে মনে শালকের ন্যুয়ার কে ই ঠিক করে রেখেছিলেন। সেই অবস্থায়  ইউনাইটেডের গোলরক্ষক কোচ ‘এরিক স্টিল’ এসে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের এক ২০ বছর বয়সী তরুন গোলকিপারের কথা শোনান স্যার অ্যালেক্স কে, এবং তাকে অনুরোধ করেন কেবল একবার ডি গিয়ার খেলা দেখে আসার জন্য। আগে থেকেই স্যার ফার্গুসন ও স্টিল একসাথে গোলরক্ষক খোঁজার জন্য স্কাউটিং করছিলেন।

স্যার ফার্গুসনের এরিক স্টিলের প্রতি জবাবটা ছিল এরকমঃ

“কিন্তু ন্যুয়ার (বর্তমান বায়ার্ন মিউনিখ এর গোলরক্ষক) তো কমপ্লিট একটা প্লেয়ার, শারীরিকভাবেও অনেক শক্তিশালি। আমার মনে হয় শালকের সাথে কথা বললে তারা খুশি হবে ন্যুয়ার কে দেবার জন্য। আমরা আমাদের যোগ্য নাম্বার ওয়ান পেয়ে গেছি।”

কিন্তু ইউনাইটেডের গোলরক্ষক কোচ এরিক স্টিল নাছোড়বান্দা, তিনি ডি গিয়ার ৩ মিনিটের গোলকিপিং ভিডিও দেখান স্যার অ্যালেক্স কে।

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন দেখলেন ভিডিও, তিনি অবশেষে রাজি হলেন ডি গিয়াকে দেখতে যাবেন। সেপ্টেম্বর ২২ তারিখে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ম্যাচ ছিল স্কানথর্প এর বিপক্ষে লিগ কাপের ম্যাচে। স্যার অ্যালেক্স এর আগে ২০০০ সালে ম্যানচেস্টার ডার্বি মিস করেছিলেন ছেলের বিবাহের জন্য।

এবার তিনি খেলা মিস দিলেন ভ্যান ডার সারের যোগ্য উত্তরসূরি খোঁজার জন্য। স্যার অ্যালেক্স আর এরিক স্টিল ২ জন মিলে ভ্যালেন্সিয়া বনাম অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ম্যাচ দেখতে চলে যান স্পেনে। ম্যাচে স্যার ফার্গি অবাক হন ডি গিয়ার ক্ষিপ্রতা, মনোযোগ, আর রিফ্লেক্স দেখে। মাত্র ৬০ মিনিটের মত খেলা দেখে সিদ্ধান্ত নেন, ডি গিয়াকেই ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিয়ে আসবেন। 

ডি গিয়া আস্থার প্রতিদান দিতে শুরু করলেন প্রথম থেকেই

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে চেলসির সাথে ম্যাচ । ম্যাচ এ ৩-৩ সমতা, অন্তিম মূহুর্তে হুয়ান মাতা সেট পিসে ফ্রি কিক নিতে আসলেন, সে সময় সেট পিসে মাতার শট ঠেকানো মোটামুটি অবিশ্বাস্য। মাতা ডান দিকে কোনাকুনি বাকানো শট নিলেন। ডি গিয়া এক অতিমানবীয় ডাইভ দিয়ে তা সেভ করে ফেললেন!  মাতা বিস্ফোরিত চোখে তা দেখে মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো, সেই সাথে মাথায় হাত চলে গেল চেলসি ও ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের প্রতিটা সমর্থকের, মুহুর্তের মধ্যে গ্যালারিতে পিন পতন নীরবতা, অবিশ্বাস্য।  

কিছুক্ষণ পর ইউনাইটেডের ফ্যানরা ভেঙে পড়লো উল্লাসে । স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন মৃদু হাসি হেসে তাকালেন গোলকিপিং কোচ এরিক স্টিলের দিকে। বললেন,”Now we’ve got a goalkeeper.” এরপর আর ডি গিয়াকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। পরের বছর প্রিমিয়ার লীগও জিতলেন ।

স্যার ফার্গি রিটায়ার করলেন ২০১৩ সালে। দায়িত্ব ছেড়ে গেলেন ময়েসের হাতে। অদক্ষ নাবিকের হাতে জাহাজ, এমন বাক্যের যেন প্রতিফলন ঘটালেন ডেভিড ময়েস। অদূরদর্শী চিন্তাভাবনার ফল প্রকাশ পেল মাঠেই। 

প্রিমিয়ার লীগ, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ থেকে মুখ থুবড়ে পড়লো রেড ডেভিলসরা। তবে সমর্থকদের আস্থার প্রতিদান দিতে ভুলেননি ডি গিয়া। ২০১৪/২০১৫ মৌসুমে ডি গিয়া লীগে ৩৭ ম্যাচে ১২ টিতে ক্লিনশিট রাখেন। গোল হজম করেন মাত্র ৪৩ টি। স্পেনের হয়ে জেতেন বিশ্বকাপ। যদিও বিশ্বকাপ একাদশে জায়গা হয়নি তার। পুরোটা সময় বেঞ্চে বসে ইকার ক্যাসিয়াসের বিকল্প হিসেবে সময় কাটান তিনি।

ইউনাইটেডে ময়েসের অধ্যায় শেষে আসেন ডাচ কোচ লুইস ভ্যান গাল। এসেই আমূল পরিবর্তনের কথা বললেও করতে পারেননি কিছুই। স্বল্প সময়েই ডাগ আউট ছাড়তে হয় তাকে। 

২০১৫/২০১৬ সিজনেও দুর্দান্ত সময় কাটান ডি গিয়া। লীগে ৩৩ ম্যাচে ৩৪ গোল হজম করে ১৫ টি ক্লিনশিট রাখেন, ইপিএলে এক কথায় যা অবিশ্বাস্য পর্যায়ে। 

২০১৬ এর জুলাইয়ে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের দায়িত্ব পান স্পেশাল ওয়ান খ্যাত হোসে মৌরিনহো। ততদিনে পুরো বিশ্বের কাছে নিজেকে চিনিয়েছেন ডি গিয়া। গত সিজনের শুরু থেকেই জোরালো গুঞ্জন ছিল, ডি গিয়া মাদ্রিদে যোগ দিবেন। তবে সব কিছু তুড়ি মেরে উড়িয়ে এই সিজনে যেন ডি গিয়া ছাড়িয়ে গেলেন নিজেকেই! 

লীগে ৩৫ ম্যাচে ২৯ গোল হজম করলেন, ক্লিন শিট রাখলেন ১৪ টিতে! ইউনাইটেডের এমন হতশ্রী পারফরম্যান্স এর দিনেও স্ব মহিমায় উজ্জ্বল তিনি। বলা চলে একক নৈপুণ্যে ক্লাবকে জেতালেন ‘এফ এ কাপ’ টাইটেল। 

২০১৭/২০১৮ সিজনে ডি গিয়া নিজেকে বসালেন অনন্য এক উচ্চতায়। যেখানে তাকে ধরার সাধ্য ছিল না কারোরই!

শুরুটা হয়েছিলো আর্সেনালের সাথে

“David de Gea could save the Titanic.” ২০১৭ তে নিজেদের মাঠে ম্যান ইউনাইটেডের কাছে ৩-১ এ হারার পর হতভম্ব আর্সেনাল ফ্যানদের এই উক্তি অমর হয়ে থাকবে । সেই ম্যাচে ডি গিয়া একাই ১৪ টা সেভ করেন এবং এর মাঝে একটা ছিল অসাধারন ডাবল সেভ। 

ম্যাচ জয়ের জন্য ভঙ্গুর ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে সবকিছুই করেছিল আর্সেনাল। আক্রমণের পর আক্রমণে টলানো যায়নি ডি গিয়াকে। প্রতিপক্ষের আক্রমণে দলের ডিফেন্স ছন্নছাড়া হয়ে যাওয়ার পরেও একাই লড়াই করে গেছেন, দলকে জিতিয়েছেন।

পুরো সিজনই ছিল ডি গিয়াময়। এই সিজনে লীগে ৩৭ ম্যাচে মাত্র ২৮ গোল হজম করেন ডি গিয়া। ক্লিন শিট রাখেন ১৮টিতে! যা তাকে এনে দেয় বহু আকাঙ্খিত ইপিএলের ‘গোল্ডেন গ্লাভস’।

সাফল্যের চূড়া থেকে একদম মাটিতে নেমে আসেন পরের সিজনেই। ডি গিয়া কি হতাশায় ভুগছিলেন? নিজের সেরাটা দেয়ার পরেও দলের হতশ্রী পারফরম্যান্স শুধু ডি গিয়া নয়, ইউনাইটেডের প্রতিটা ফ্যানকেই আবেগ আপ্লুত করছিলো। 

২০১৮-২০১৯ সিজন মোটেও ভালো যায়নি ইউনাইটেড এবং ডি গিয়ার। সিজনের শুরুতে রাশিয়া বিশ্বকাপে মূল গোলরক্ষক হিসেবে গেলেও ভুলে যেতে চাইবেন তিনি ও পুরো স্পেন! তার ওপর এই সিজনেই স্যাকড হন ইউনাইটেড বস স্পেশাল ওয়ান হোসে মৌরিনহো। সিজনে লীগে মাত্র ৭টি ক্লিনশিট রাখেন ডি গিয়া। যা ইউনাইটেডের হতশ্রী পারফরম্যান্স এরই অনুরুপ!

২০১৯ এর মার্চে স্থায়ী ম্যানেজার হিসেবে রেড ডেভিলদের ডাগ আউটে আসেন  ইউনাইটেডের কেয়ার টেকার ম্যানেজার ‘ওলে গানার সোলস্কার’। সোলস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল ইউনাইটেড দলটাতে ভারসাম্য আনা। এসেই ডিন হেন্ডারসনকে লোনে দিয়ে দেন শেফিল্ড ইউনাইটেডে। আস্থা রাখেন তার বসের প্রিয় শিষ্য ডি গিয়ার প্রতি। ডি গিয়াও আস্থার প্রতিদান দেন, লীগে ১৩ টি ক্লিনশিট রেখে জানান দেন ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট। 

কিন্তু সোলস্কার ব্যর্থ হন তার লক্ষ্যে পৌছোতে। ২০২০-২০২১ সিজনেই হতশ্রী পারফরম্যান্স করে ইউনাইটেড। ইউনাইটেড এর মত দলের সাফল্য একটাই, চ্যাম্পিয়ন হওয়া। কিন্তু নগর প্রতিদ্বন্দ্বী সিটির সাথে বড় পার্থক্য রেখে দ্বিতীয় অবস্থানে শেষ করে সিজন। এই সিজনে ডি গিয়া বাজে পারফর্ম করেন।সিজনের মাঝেই ডেকে আনা হয় লোনে থাকা ডিন হেন্ডারসন কে। ফলে গুঞ্জন উঠতে থাকে, গিয়া ক্লাব ছাড়ছেন। যদিও সিজন শেষে ক্লাব ছাড়েননি তিনি। 

২০২১ এর নভেম্বরে ইউনাইটেডে শেষ হয় ওলে গানার সোলস্কারের অধ্যায়। সাময়িক ম্যানেজার হিসেবে নিযুক্ত হন গগন প্রেসিং এর জনক হিসেবে খ্যাত ‘রাল্ফ র‍্যাগনিক’। বরাবরের মত চলতি সিজনেও রাল্ফ র‍্যাগনিকের আস্থার প্রতিদান দিয়ে চলেছেন ডি গিয়া। রোনালদো-ব্রুনো-পগবা-ভারানেদের ছাপিয়ে নিজ আলোতে উজ্জ্বল তিনি। জানান দিচ্ছেন, ডি গিয়া ফুরায় না। ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে, প্রিমিয়ার লীগে ৩৬১ ম্যাচে ১২৮টিতে ক্লিনশিট রেখেছেন  ইউনাইটেডের দুর্দিনের কান্ডারী। ইউনাইটেডের হয়ে তার খেলা হয়ে গেছে ৪৬৯ টি ম্যাচ। ক্লিনশিট ১৬০ টিতে। পরিসংখ্যান দিয়ে ডি গিয়াকে বিচার করা মস্ত বড় ভুল। ডি গিয়া এবং ওল্ড ট্র‍্যাফোর্ড , এই ডুয়ো ছিল  গত এক দশকে ইউনাইটেডের প্রতিটি সমর্থকের একমাত্র আশা-ভরসা। যা বিদ্যমান আছে আজও।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top